
বাংলাদেশের রাজনীতি ৫ আগস্টের পর একটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার সমীকরণে নয়, বরং জনমানস, রাজনৈতিক ভাষা এবং গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডেও স্পষ্ট। অতীতে যেসব কৌশল দিয়ে জনমত প্রভাবিত করা যেত—গালাগালি, ভয়ভীতি, পেশিশক্তি কিংবা কৃত্রিম প্রোপাগান্ডা—বর্তমান বাস্তবতায় সেগুলো ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সময় এখন আদর্শের, যুক্তির এবং রাজনৈতিক সততার।
রাজনীতিতে আদর্শের মোকাবিলা আদর্শ দিয়েই করতে হয়। পুরনো ধাঁচের চরিত্রহনন, মিথ্যাচার ও ভয়ের রাজনীতি দিয়ে নতুন প্রজন্মকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। যারা এখনো এই পুরনো কৌশল আঁকড়ে ধরে আছে, তারা অজান্তেই সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। এটা কোনো আবেগী ভবিষ্যদ্বাণী নয়—এটা বাস্তবতার নির্মম সত্য।
চরিত্রহননের রাজনীতি, মানুষ খুনের রাজনীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস—এসব শুধু নৈতিকভাবে ঘৃণ্যই নয়, রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতীও। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই পথ অনুসরণ করে কেউ দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারেনি। যারা এসব পরিহার না করে সামনে এগোতে চায়, তারা একসময় শুধু ভোটের রাজনীতিতেই নয়, রাজনীতির মূল ময়দান থেকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
আরেকটি বড় সংকট হলো—বাস্তব জনসমর্থনহীন ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরতা। শাহরিয়ার কবির, কিছু বামপন্থি নেতা কিংবা ইনু-মেননের মতো রাজনীতিকদের পরামর্শে পরিচালিত রাজনীতি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক কল্পনার জগৎ তৈরি করে। এদের সঙ্গে মাঠের মানুষ নেই, নেই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। একইভাবে নুর কিংবা আন্দালিব রহমানের মতো ব্যক্তিদের ওপর ভর করাও বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল। তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল, যা দিয়ে কোনো টেকসই রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব নয়।
পথভ্রষ্ট কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী কিংবা আওয়ামী ওলামা লীগের মতো পাপেট সংগঠনের ওপর ভরসা করে রাজনীতি করা মানে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই অনিশ্চিত করে তোলা।
রাজনীতিতে প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান, নৈতিক দৃঢ়তা এবং আদর্শিক স্থিরতা—সুযোগসন্ধানী চরিত্র নয়।
এই প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাওলানা জুনায়েদের মতো দোদুল্যমান অবস্থানের ব্যক্তির চেয়ে রুমিন ফারহানার মতো স্পষ্টভাষী ও দৃঢ় অবস্থানের মানুষ রাজনীতির জন্য বেশি প্রয়োজনীয়। নুরের মতো সুবিধাবাদীর চেয়ে হাসান মামুনের মতো আদর্শিক ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব অনেক বেশি কার্যকর। কারণ সুবিধাবাদীরা বসন্তের কোকিল—সময় এলেই উড়ে যায়, দায়ভার নেয় না।
বিশেষভাবে বিএনপির জন্য এখানে একটি বড় সতর্কবার্তা রয়েছে। যদি দলটি শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ভুলে গিয়ে আওয়ামী লীগের দমনমূলক আচরণ অনুকরণ করে, যদি ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে অযথা বিরোধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের জন্যই বুমেরাং হবে। বাংলাদেশের মানুষ ইসলামপ্রিয়, কিন্তু তারা অন্যায় ও স্বৈরতন্ত্রকেও ঘৃণা করে—এই দ্বৈত বাস্তবতা অস্বীকার করলে রাজনৈতিক ক্ষতির দায় কাউকেই এড়াতে পারবে না।
দিনশেষে বাংলাদেশের রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সার্বভৌম, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন।
বাংলাদেশ যেন কোনো পরাশক্তির আধিপত্যের শিকার না হয়। বাংলাদেশ হোক সকল দলের, সকল মত ও পথের মানুষের দেশ—যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকবে, থাকবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, থাকবে ইসলামপ্রিয় কিন্তু মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা।
এই নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে হবে, ভাষাকে সংযত করতে হবে এবং আদর্শকে সামনে আনতেই হবে। এর কোনো বিক ল্প নেই।
মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক
ব্যুরো অব সোশ্যাল ওয়াচ
সাংবাদিক, কলামিস্ট, আন্তর্জাতিক অভিভাষণ বিষয়ক পরামর্শক।
Email : anwar.neogen@gmail.com
Leave a Reply