
লেখক: মোঃ জহিরুল ইসলাম হামিদ:
রাতের আঁধারে প্রজ্ঞাপন, সকালে নতুন দাম—এভাবেই দেশের মানুষকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এখন ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।
সরকারের যুক্তি অবশ্যই আছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন—বিপিসি—মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্তের বোঝাটা শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে গিয়ে পড়ছে?
সাধারণ ভোক্তা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক—সবাই এর প্রভাব অনুভব করবেন। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কাও হচ্ছে, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
এই তালিকায় আরেকটি পেশার কথা কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি?
সাংবাদিকতা।
বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতা।
একজন ডেস্কে বসা সাংবাদিকের কাজের ধরন আর একজন মাঠের সাংবাদিকের বাস্তবতা এক নয়। দুর্ঘটনা ঘটেছে—ছুটতে হবে ঘটনাস্থলে। আগুন লেগেছে—ছুটতে হবে সেখানে। কোথাও অভিযান, গ্রেপ্তার, মানবিক সংকট, প্রশাসনিক কার্যক্রম কিংবা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ—সংবাদ নিশ্চিত করতে সাংবাদিককে যেতে হয় মানুষের কাছে।
আর সেই ছুটে চলার বড় একটি মাধ্যম মোটরসাইকেল।
অনেক সাংবাদিকের অফিস থেকে পর্যাপ্ত যাতায়াত ভাতা নেই। অনেকের বেতন সীমিত। সংবাদ সংগ্রহের জন্য নিজের মোটরসাইকেল, নিজের জ্বালানি, নিজের মোবাইল ডাটা—সবকিছুর খরচ নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়।
এখন অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা।
একজন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক যদি প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহের কাজে কয়েক লিটার জ্বালানি ব্যবহার করেন, মাস শেষে শুধু জ্বালানি বাবদ তাঁর আয়ের একটি বড় অংশ চলে যেতে পারে। এর সঙ্গে মোটরসাইকেলের রক্ষণাবেক্ষণ, মোবাইল বিল, ইন্টারনেট, খাবার ও অন্যান্য মাঠখরচ তো আছেই।
তাহলে প্রশ্নটা খুবই সরল—একজন সীমিত বেতনের সাংবাদিক এই ব্যয় কতদিন বহন করবেন?
সরকার জ্বালানির দাম বাড়ানোর অর্থনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্ন হলো—এই বাড়তি ব্যয়ের সামাজিক ও পেশাগত প্রভাব নিয়ে কি কোনো হিসাব আছে?
আমরা কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছি না, যেখানে সংবাদ সংগ্রহের আগে একজন সাংবাদিককে হিসাব করতে হবে—‘এই খবর করতে গেলে আমার মোটরসাইকেলে কত টাকার তেল লাগবে?’
যদি কোনো সাংবাদিক কোনো দূরবর্তী এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ খবরের সন্ধান পান, কিন্তু সেখানে যেতে জ্বালানি খরচ হয় তাঁর এক দিনের আয়ের বড় অংশ—তাহলে তিনি কী করবেন?
খবরটি কি বাদ দেবেন?
নাকি নিজের সংসারের প্রয়োজনীয় টাকা থেকে জ্বালানির খরচ দেবেন?
এটি শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বাস্তব সংকট।
অবশ্যই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা আছে। বিপিসির লোকসানের প্রশ্ন আছে। বৈদেশিক মুদ্রা, আমদানি ব্যয় ও চোরাচালান ঠেকানোর বিষয়ও সরকারের বিবেচনায় থাকতে পারে।
কিন্তু সরকারের প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাবও তো হিসাব করতে হয়।
যদি জ্বালানির দাম বাড়ে, তাহলে সংবাদমাধ্যমের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। মাঠকর্মীদের যাতায়াত ব্যয় বাড়বে। ছোট সংবাদমাধ্যমগুলো আরও চাপের মধ্যে পড়বে। আর এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সেই সাংবাদিকদের ওপর, যারা অল্প বেতনে সবচেয়ে বেশি মাঠে কাজ করেন।
যে সাংবাদিক রাত-বিরাতে মানুষের বিপদে ছুটে যান, তাঁর নিজের পকেটের বিপদটি কি রাষ্ট্র দেখবে না?
আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি করছি না। আমরা চাই বাস্তবতাকে স্বীকার করা হোক।
জ্বালানির দাম বাড়তেই পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ থাকতেই পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বাস্তবসম্মত যাতায়াত ভাতা, মাঠভাতা এবং পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
কারণ সাংবাদিকতা শুধু অফিসের ডেস্কে বসে করা কোনো চাকরি নয়।
অনেক সময় একজন সাংবাদিকের মোটরসাইকেলের চাকা ঘুরলেই একটি ঘটনা মানুষের সামনে আসে। সেই চাকা থেমে গেলে থেমে যেতে পারে কোনো একটি এলাকার মানুষের কণ্ঠও।
তাই প্রশ্নটা শুধু অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা হলো কি না—প্রশ্ন হলো, এই দামে মাঠের সাংবাদিকের কলম কতদিন চলবে?
রাষ্ট্রের অর্থনীতি বাঁচানোর হিসাব নিশ্চয়ই প্রয়োজন। কিন্তু সেই হিসাবের খাতায় সাংবাদিকের পকেট, মাঠের বাস্তবতা এবং মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার—এই তিনটিকেও কি রাখা হবে না?
কারণ জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সংবাদ সংগ্রহের সক্ষমতাও কমে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু সাংবাদিকের নয়—ক্ষতিটা হবে পুরো সমাজের।
তেলের দাম বাড়তেই পারে; কিন্তু মানুষের খবর পৌঁছে দেওয়ার পথ যেন সংকুচিত না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
Leave a Reply